সামাজিক বৈষম্য আর লোকলজ্জার দেয়াল ভেঙে শিক্ষার আলোয় নিজেদের আলোকিত করতে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন রংপুরের ২৮ জন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী। শুক্রবার সকালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসএসসি (প্রোগ্রাম-২০২৬) পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছেন যে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই বড় নয়।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এই ২৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসেন। ২৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী এসব পরীক্ষার্থীর চোখে-মুখে ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ। দীর্ঘ বছর পড়াশোনা থেকে দূরে থাকার পর আবারও কলম তুলে নিয়েছেন তারা। পরীক্ষা শেষে তারা জানান, এই লড়াই শুধু একটি সার্টিফিকেটের জন্য নয়, বরং সমাজে নিজেদের অস্তিত্বের স্বীকৃতির লড়াই।
এই শিক্ষার্থীদের মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন আনোয়ারা ইসলাম রানী। স্থানীয়ভাবে ‘গুরু মা’ হিসেবে পরিচিত ৩৩ বছর বয়সী রানী নিজেও এবার পরীক্ষার্থী। আইটি ও কম্পিউটারে দক্ষ রানী দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন:
”এটি শুধু একটি পরীক্ষা নয়, আমাদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি। আমরা শিক্ষিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই, সমাজের মূলধারার মানুষের মতো সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই।”
শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীরা মনে করছেন, এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি মাইলফলক। সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের নমনীয় পাঠদান পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে তৃতীয় লিঙ্গের এই মানুষগুলো এখন স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা সম্মানজনক চাকরি করার।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, রংপুর বিভাগের ৯টি কেন্দ্রে এবার মোট ১,১৩২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে মিঠাপুকুর কেন্দ্রে মোট ১৫৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৮ জনই তৃতীয় লিঙ্গের। কেন্দ্র সচিব ও প্রধান শিক্ষক মাহেদুল আলম জানান, এই পরীক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে যে শেখার আগ্রহ দেখা গেছে, তা অন্যদের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
Leave a Reply